আধুনিক পদ্ধতিতে উন্নত জাতের গাভী পালন পদ্ধতি ও প্রশিক্ষণ

কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রাণিসম্পদ সাব-সেক্টরের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। অনাদিকাল থেকেই এদেশের মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার তাগিদে গবাদিপশু-পাঁখি লালন পালনে সম্পৃক্ত রয়েছে। জিডিপি’তে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ২.৫%। এই উপখাত থেকে মানব দেহের জন্য অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদান প্রাণিজ আমিষ (দুধ, মাংস ও ডিম) উৎপাদিত হয়। প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৫০% প্রাণিসম্পদ সাব-সেক্টরে থেকে আসে। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ২২% সরাসরি এবং ৫০% পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদ খাতের উপর নির্ভরশীল। সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার উল্লেখযোগ্য লক্ষ্য দারিদ্র বিমোচন, নারী-পুরুষে সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন প্রাণিসম্পদ খাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই বর্তমান সরকার এ খাতের উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এই উপখাতের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষ গতানুগতিক পদ্ধতিতে গবাদিপশু-পাঁখি লালন পালনে অভ্যস্ত, যদিও এ কর্মকান্ডসমূহের অধিকাংশই প্রযুক্তি নির্ভর।

গাভী পালন পদ্ধতি

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গবাদিপশু-পাখি পালনে উন্নত প্রযুক্তি উদ্বাবন, এর ব্যবহার ও সম্প্রসারণ, খামারিদের সচেতনতা বৃদ্ধি, খামারের জীব নিরাপত্তার উন্নয়ন, রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, মার্কেট চেইন উন্নয়ন, উন্নত ঘাস চাষ, উন্নত জাতের সিমেন ব্যবহার করে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নসহ নানাবিধ কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে গবাদিপশু-পাঁখি লালন পালনে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে খামারিদের মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে যা দেশে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদনে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে দুধ, মাংস ও ডিম উৎপাদন যথাক্রমে ৫০.৬৭ লক্ষ মেট্রিক টন, ৩৬.২ লক্ষ মেট্রিক টন ও ৭৬১.৭৪ কোটিতে উন্নীত হয়েছে এবং দুধ, মাংস ও ডিমের জনপ্রতি প্রাপ্যতা যথাক্রমে ৯১.০৩ মি.লি/দিন, ৬৫.০৩ গ্রাম/দিন ও ৫০.০ টি/বছর এ উন্নীত হয়েছে। এই লেখাটিতে গাভী পালন, গরু মোটাতাজাকরণ এবং ব্রয়লার মুরগী পালনে এ আধুনিক পদ্ধতির বিষয়ে আলোকপাত করার প্রয়াস করা হলো।

উন্নত জাতের গাভী পালন

গাভী পালনের গুরুত্বঃ
গাভীর দুধ সুস্বাদু ও পুষ্টিকর আদর্শ খাদ্য যা জাতীর মেধা বিকাশের জন্য প্রয়োজন। গাভী পালনের মাধ্যমে আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র হ্রাসকরণসহ অর্থনৈতিক সচ্চলতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে।

উৎপাদিত দুধ বিক্রি করে দৈনিক নগদ অর্থ উপার্জন করা যায়। দুধ থেকে ঘি, মাখন, ননী, মাঠা, ঘোল, চিজ, দধি, মিষ্টি, ছানা, লাচ্চি, বোরহানি, মন্ডা, রসমালাই, ক্ষীরসা, চকলেট সহ আরো অনেক ধরনের সুস্বাদু খাদ্য তৈরী হয়।

আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হলে গোবর থেকে জৈব সার এবং বায়োগ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে নিজস্ব জ্বালানী চাহিদা মেটানো যায়, পরিবেশ সংরক্ষনে ভূমিকা রাখা যাবে এবং গবাদিপশু পালনকারীগণ অর্থনৈতিকভাবে সচ্চল হবে।

উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে বড় খামার স্থাপন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

গাভী পালনে বিবেচ্য বিষয়াবলীঃ

গাভীর বাসস্থান ও ব্যবস্থাপনা।
গাভীর জাত নির্বাচন।
প্রজনন ব্যবস্থাপনা।
খাদ্য ব্যবস্থাপনা।
গাভীর যত্ন এবং বাছুরের যত্ন।
রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি।
বাজারজাতকরণ ও রেকর্ড কিপিং।

দুগ্ধবতী গাভীর জাতঃ
অঞ্চলভেদে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি স্থানীয় দুগ্ধ জাতের গাভী পাওয়া যায়। এগুলো হলো পাবনা জাত, রেড চিটাগাং ও মুন্সিগঞ্জ ভেরাইটি। তাছাড়া বর্তমানে দেশে হলস্টিন ফ্রিজিয়ান, শাহীওয়াল জাতের সংকরায়ন করা হচ্ছে।
ফ্রিজিয়ানঃ
আকারে বড়, গায়ের রং সাদা ও কালো মিশ্রিত, কুজ অনুন্নত, গাভীর গড় ওজন ৫৫০-৬৫০ কেজি এবং ষাড়ের গড় ওজন ৮০০-৯০০ কেজি হয়ে থাকে। প্রথম গর্ভধারণের বয়স ১৮-২৪ মাস, সদ্যজাত বাছুরের গড় ওজন ৩০-৩৬ কেজি, গাভীর ওলান বড় এবং দৈনিক গড় দুধ উৎপাদন ২৫-২৮ লিটার।
শাহীওয়ালঃ
আকারে মাঝারী থেকে বড়, গায়ের রং হালকা লাল থেকে লালচে বাদামী, কুজ সামান্য উন্নত, কপাল উচু, গলকম্বল খানিকটা ঝুলন্ত, গাভীর গড় ওজন ৪০০-৫০০ কেজি এবং ষাড়ের গড় ওজন ৬০০-৭০০ কেজি হয়ে থাকে। প্রথম গর্ভধারণের বয়স ২৩-৩০ মাস, সদ্যজাত বাছুরের গড় ওজন ২০-২৫ কেজি, গাভীর ওলান মোটামোটি বড় এবং দৈনিক গড় দুধ উৎপাদন ১০-১৫ লিটার।

গাভী পালন প্রশিক্ষণ

দুগ্ধবতী গাভীর বৈশিষ্ট্য ও চেনার উপায়ঃ
গাভীর বয়সের দিকটা বিবেচনা করতে হবে। সাধারণত ৩য় প্রসবে দুধের উৎপাদন বেশী হয়ে থাকে। গাভী নির্বাচনে খামারীর অভিজ্ঞতার মূল্য আছে। গাভীর বাবা ও মায়ের তথ্য (পিডিগ্রি) জানতে হবে।
মাথা হালকা ও ছোট আকারের, কপাল প্রশস্ত, চোখ উজ্জ্বল, দেহের আকার সামনের দিকে হালকা ও পিছনের দিকে ভারী ও সুগঠিত, অপ্রয়োজনীয় চর্বিমুক্ত, চামড়া ঢিলেঢালা, লোম মসৃণ, দেহের অনুপাতে ওলানের আকার বড়, গঠন সুন্দর, চারটি বাট সমান দুরত্বে ও সমান আকারের, পিছনের দুপায়ের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত, দুগ্ধ শিরা মোটা, স্পষ্ট ও তলপেটে নাভীর দু’পাশে আঁকাবাঁকা ভাবে বিন্নস্ত এবং সর্বপরি দূর থেকে গাভীকে দেখতে অনেকটা ত্রিভূজাকৃতির হবে।

বাসস্থান নির্বাচনে ও ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তিগত দিকঃ
বাসস্থান হবে প্রচুর আলো বাতাসযুক্ত স্থানে। গোয়াল ঘর পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বীভাবে তৈরী করতে হবে।গোয়াল ঘর স্থাপনের ধরণ ৩ ধরনের হতে পারে। যথাঃ উন্মুক্ত ঘর, কমিউনিটি ঘর ও আবদ্ধ ঘর এবং প্রচলিত ঘর। আবদ্ধ ঘরে গরু এক সারি বা দুই সারিতে পালন করা যায়। দুই সারি বিশিষ্ট ঘরে অন্তর্মূখী বা বহির্মূখী পদ্ধতিতে গাভী পালন করা হয়।

প্রতি গাভীর জন্য গড়ে ৩৫-৪০ বর্গ ফুট (৮’x৫’) জায়গার প্রয়োজন হবে। ঘরের মেঝে থেকে চালার উচ্চতা কমপক্ষে ১০ ফুট হতে হবে। টিনের চালা বিশিষ্ট ঘর হলে টিনের চালার নিচে চাটাই ব্যবহার করতে হবে।
গোয়াল ঘরে খাদ্য সরবরাহের জন্য ৫ফুট প্রশস্ত রাস্তা, খাদ্য পাত্র ও পানির পাত্রের জন্য ২ ফুট এবং নালার জন্য ১ ফুট জায়গা রাখতে হবে। গোয়াল ঘরের বর্জ নিষ্কাষনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ রাখতে হবে। ঘরের মেঝে পাকা হলে মসৃণ প্লাষ্টার না করে খসখসে রাখতে হবে যাতে গরু পিছলিয়ে পড়ে না যায়। মেঝে নালার দিকে হালকা ঢালু হবে কিন্তু তা সর্বোচ্চ ১.৫ ইঞ্চি হতে পারে।

ঘরের দেয়াল নীচের দিকে সর্বোচ্চ ১.৫ফুট হবে যাতে শুয়া অবস্থায়ও পশুর শরীরের উপর দিয়ে বাহিরের বাতাস প্রবাহিত হয় এবং বাকী অংশ ১বর্গ ইঞ্চি ফাঁকা ফাঁকা রেখে জিআই তার দিয়ে বেষ্টনী দিতে হবে। ফলে গোয়াল ঘরে পর্যাপ্ত আলো বাতাস প্রবেশ করতে পারবে। গাভীর উৎপাদন বাড়বে এবং রোগ ব্যাধী কম হবে।

গোয়াল ঘর প্রতিদিনই এক বা একাধিকবার ভালভাবে পরিষ্কার করতে হবে। গোবর, চনা, খাদ্যের বর্জিতাংশ পরিষ্কার করে তা নির্ধারিত পিট/গর্তে ফেলতে হবে। সবচেয়ে ভাল হয় যদি খামারে বায়োগ্যাস প্লান্ট থাকে এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট এর পিটে স্থানান্তর করা যায়।
খামারে প্রতিদিন এন্টিসেপটিক স্প্রে করতে হবে। এতে রোগ সংক্রমণ কমবে, মশা-মাছির উপদ্রব কমবে। সপ্তাহে অন্তত একবার ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করে গরুর সেড ভালভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

দুগ্ধবতী গাভী পালন

প্রজনন ব্যবস্থাপনাঃ
আমাদের দেশে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিমভাবে গাভীতে প্রজনন করা হয়ে থাকে । কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতিতে গাভীকে প্রজনন করানোর জন্য বর্তমানে উৎসাহিত করা হয়। কারণ ইহা প্রজননের আধুনিক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে উন্নত জাতের ষাড় থেকে বীজ সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করে গাভীতে প্রজনন করা হয়। এতে ষাড় থেকে বিভিন্ন রোগ গাভীতে স্থানান্তরিত হতে পারে না এবং সাথে সাথে গাভীর উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কেন্দ্রিয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারে উন্নত জাতের ষাড়ের সিমেন উৎপাদন এবং তা সারাদেশে বিতরণ ও গাভীতে কৃত্রিম প্রজননের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। কৃত্রিম প্রজনন প্রকৃয়ায় বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো;

আকারে বড় এবং স্বাস্থ্যবতী গাভীতে কৃত্রিম প্রজনন করা প্রয়োজন। গাভী বা বকনা ডাকে আসলে কিছুটা অশান্ত হয়ে উঠে, অন্য গাভীর উপর লাফিয়ে উঠতে চায়, যোনীদ্বার দিয়ে স্বচ্ছ আঠালো ঝিল্লি নিঃসৃত হয়, স্থির হয়ে অন্য গরুকে নিজের উপর লাফিয়ে উঠতে প্ররোচিত করে এবং অন্য গাভীর যৌনাঙ্গ শুকতে/চাটতে থাকে। এসকল লক্ষণ দেখা গেলে বুঝতে হবে গাভী/বকনা ডাকে এসেছে। গাভীটিকে দক্ষ কৃত্রিম প্রজনন কর্মীর মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন করাতে হবে।

গাভী ডাকে আসার ১২-১৮ ঘন্টার মধ্যে কৃত্রিম প্রজনন করা উত্তম, এতে সফলতার হার বেশী। কৃত্রিম প্রজননে সফলতার হার ৫৫% অর্থাৎ ১০০ গাভীকে কৃত্রিম প্রজনন করানো হলে ৫৫টি গাভী গর্ভবতী হয় এবং বাচ্চা উৎপাদন হয়। অতএব যেসকল গাভী বাচ্চা ধারণ করেনি সেগুলোকে ২০-২১ পর আবার ডাকে আসলে পুণরায় প্রজনন করাতে হবে। কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতিতে সংকরায়ন এর মাধ্যমে গাভীর উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।

রুণ স্থানান্তর প্রযুক্তি ব্যবহার করে উন্নত জাতের বাচ্চা উৎপাদন সম্ভব। ডেইরী শিল্প বিকাশে ইহা একটি উন্নত প্রযুক্তি। তবে ইহার ব্যবহার সীমিত। এই প্রযুক্তিতে ইন-ভিভো ফার্টিলাইজেশন করে গাভীর গর্ভধানীতে স্থানান্তর করে বাচ্চা উৎপাদন করা হয়।
অতি সম্প্রতি মাংশল জাতের গরু উৎপাদনের লক্ষ্যে উন্নত ব্রাহমা জাতের ষাড়ের বীজ ব্যবহার করে কৃত্রিম প্রজনন করে সুফল পাওয়া গেছে যা সহসাই মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হবে।

গাভীর খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ
গাভীর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা কাঙ্খিত পর্যায়ে ধরে রাখতে হলে গাভীকে সুষম ও সঠিক পরিমাণে খাদ্য প্রদান অত্যাবশ্যকীয়। গরুর সুষম খাদ্য তৈরীর জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ হলো; খড়, সবুজ ঘাস, দানাদার খাদ্য এবং পানি। ১০০ কেজি দৈহিক ওজন বিশিষ্ট একটি গাভীর জন্য সাধারণত ১-২ কেজি খর, ৫-৬ কেজি সবুজ ঘাস এবং ১-১.৫ কেজি দানাদার খাদ্য প্রদান করতে হয়। দানাদার খাদ্য মিশ্রনে গমের ভূষি ৫০%, চাউলের কুঁড়া ২০%, খেসারি ভাঙ্গা ১৮%, খৈল ১০% খনিজ মিশ্রণ ১% এবং আয়োডিন লবন ১% থাকা প্রয়োজন। দুগ্ধবতী গাভীর ক্ষেত্রে প্রথম ১ লিটার দুধ উৎপাদনের জন্য ৩ কেজি দানাদার খাদ্য এবং পরবর্তী প্রতি ৩ লিটার দুধ উৎপাদনের জন্য ১ কেজি হারে দানাদার খাদ্য প্রদান করতে হয়।
নিম্নে ২৫০- ৩০০ কেজি দৈহিক ওজনের দুগ্ধবতী গাভীর (দৈনিক দুধ উৎপাদন ১৩ লি.) জন্য সুষম খাদ্য তালিকা দেয়া হলো।

উপাদান দৈনিক প্রদে পরিমান
১। কাঁচা সবুজ ঘাস ৯-১২ কেজি
২। শুকনো খড় ৩-৪ কেজি
৩। দানাদার খাদ্য মিশ্রণ
৪-৭ কেজি
গাভীর খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে আধুনিক পদ্ধতি অবলম্বন করলে খাদ্যে পাচ্যতা, পুষ্টিগুন ও উৎপাদন বৃদ্ধি করা যায়।
নিম্নে কয়েকটি প্রযুক্তির সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করা হলো।

সবুজ ঘাস চাষ ও প্রক্রিয়াকরণঃ
গো-খাদ্য হিসাবে বর্তমানে দেশে কয়েক ধরণের ঘাস চাষ করা হয়ে থাকে যথাঃ নেপিয়ার, জার্মান, প্যারা, গিনি ও ভূট্টা। এসকল জাতের ঘাস অল্প জমিতে অধিক ফলে এবং পুষ্টিগুণ উন্নত। গবাদি পশু লালন পালনে সবুজ ঘাসের প্রয়োজনীয়তা অত্যাবশ্যকীয়। নেপিয়ার ঘাসের কাটিং বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসের প্রথম বৃষ্টির পর পর রোপন করতে হয়। চারা রোপনে এক সারি থেকে অন্য সারির দুরত্ব ১.৫-২ফুট এবং এক চারা থেকে অন্য চারা ১-১.৫ ফুট হওয়া প্রয়োজন। এই ঘাস একটু উচু জমিতে রোপন করতে হবে। প্রতি ৪০-৪৫ দিন পর পর কেটে গবাদি পশুকে খাওয়ানো যায়। প্রয়োজনীয় সেচ প্রদান করা গেলে সারা বছরই এই ঘাসের ভাল ফলন পাওয়া যায়। জার্মান ঘাসও নেপিয়ার ঘাসের মতই চাষ করা যায়।

প্যারা ঘাসের কাটিং অল্প পানি যুক্ত জমিতে রোপন করতে হয়। চারা রোপনে এক সারি থেকে অন্য সারির দুরত্ব ১.৫-২ফুট হওয়া প্রয়োজন। এই ঘাস একটু উচু, নীচু, জলাবদ্ধ এমনকি হালকা লোনা পানি যুক্ত জমিতে রোপন করা যায়। প্রতি ৪০-৪৫ দিন পর পর কেটে গবাদি পশুকে খাওয়ানো যায়। এসকল ঘাসের ফলন বছরে একর প্রতি ৪০০০০ -৬৫০০০ কেজি। ভূট্টা সাধারণত বর্ষা পানি চলে গেলে রোপন করতে হয় তবে সারা বছরই ভূট্টার চাষ করা যেতে পারে। ভূট্টা চাষে একদিকে যেমন গবাদি পশুর জন্য সবুজ/খড় জাতীয় খাদ্য উৎপাদিত হয় অন্যদিকে হাঁস-মুরগীর দানাদার খাদ্য উৎপাদিত হয়। সবুজ ঘাস ৪-৬ ইঞ্চি করে কেঁটে দিলে এর পাচ্যতা বৃদ্ধি পায় এবং সহজেই গবাদি পশুর শরীরে শোষিত হয়।

বিশেষ ধরনের খাদ্য প্রস্তুতি ও সংরক্ষনঃ
ইউরিয়া মোলাসেস স্ট্র (ইউ.এম.এস)ঃ
খড়কে পক্রিয়াজাত করে ইউ.এম.এস তৈরী করা হয়। খড়ের সাথে নির্ধারিত মাত্রায় ইউরিয়া সার এবং চিটাগুড় (মোলাসেস) মিশিয়ে এই খাদ্য তৈরী করা হয়। এতে খড়ে আমিষ ও শর্করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, খাদ্যে পুষ্টিগত মান উন্নয়ন হয়, সুস্বাদু হয়, সহজ পাচ্য হয় এবং গবাদিপশুর দৈহিক গঠনে সহায়তা করে। একবার তৈরীকৃত ইউ.এম.এস সর্বোচ্চ তিন দিন পর্যন্ত গবাদি পশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে খরের পরিবর্তে খাওয়ানো যায়। ১০ কেজি ইউ.এম.এস তৈরীর প্রয়োজনীয় উপাদান ও প্রস্তুত প্রণালী নিম্নে দেওয়া হলো।

উপাদান পরিমাণ
১। শুকনো খড় ৮.২ কেজি
২। মোলাসেস (চিটাগুড়)
১.৫ কেজি
৩। ইউরিয়া সার ৩০০ গ্রাম
৪। পানি পরিমাণ ম লিটার অ শোষণ করত

প্রস্তুত প্রণালীঃ
প্রথমে প্রয়োজনীয় পরিমান খড়, ইউরিয়া, চিটাগুড় এবং পানি মেপে নিতে হবে। এবার খড়গুলোকে ৪-৫ ইঞ্চি লম্বা করে কেঁটে নিয়ে একটি পলিথিনের উপর বিছিয়ে দিতে হবে। একটি বালতি/পাত্রে পরিমাণমত পানিতে ওজনকৃত ইউরিয়া সার ভালভাবে মিশাতে হবে। সার মিশ্রিত পানিতে চিটাগুড় ঢেলে ভালভাবে মিশাতে হবে। এই মিশ্রণ এবার খড়ের উপর স্প্রে/ছিটিয়ে মিশাতে হবে যাতে খড় তা শোষণ করে নেয়। মিশ্রিত খড় এবার খাওয়ানো যাবে। উল্লেখ্য যে, কখনোই ইউরিয়া সারের পরিমান বৃদ্ধি করা যাবে না বা সার মিশ্রিত পানি সরাসরি পশুকে খাওয়ানো যাবে না কারণ এতে বিষক্রিয়া হতে পারে।

ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক (ইউ.এম.বি):
ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক হলো গবাদিপশুর দানাদার খাদ্যে ইউরিয়া প্রয়োগ করে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য যার পুষ্টিগত মান অনেক বেশি। ইউএমবি তে খনিজ লবন ও ভিটামিন দেয়া হয় যা গবাদিপশুর ভিটামিন ও মিনারেলের চাহিদা পূরণ করে। ১০ কেজি ইউ.এম.বি তৈরীর প্রয়োজনীয় উপাদান ও প্রস্তুত প্রণালী নিুের ছকে দেওয়া হলো।

উপাদান পরিমাণঃ
১। গমের ভূষি ২.৬ কেজি
(২৫-২৬%)
২। মোলাসেস (চিটাগুড়)
৫.৯ কেজি (৫০-৬০%)
৩। ইউরিয়া সার ৮০০ গ্রাম (৮-৯%)
৪। পাথুরী চুন (খাওয়ার চুন)
৫০০ গ্রাম (৫-৬%)
৫। আয়োডিন লবন ৩৫ গ্রাম
৬। ডিবি ভিটামিন
১০০ গ্রাম

প্রস্তুত প্রণালীঃ
প্রথমে প্রয়োজনীয় পরিমান গমের ভূষি, ইউরিয়া, চিটাগুড় এবং পাথুরি চুন, লবন এবং ডিবি ভিটামিন মেপে নিতে হবে। ইউ.এম.বি তৈরীর পূর্বের দিন অল্প পানিতে চুন ভিজিয়ে রাখতে হবে। এবার একটি পাত্রে মোলাসেস গরম করতে হবে এবং গমের ভূষি ঢেলে ভালভাবে মিশাতে থাকতে হবে। চুন, ভিটামিন, ইউরিয়া সার এবং লবন ভালভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এবার চুলার উপর পাত্রে রাখা গরম ভুষি মিশ্রিত মোলাসেস এর সাথে চুন, ভিটামিন, ইউরিয়া সার এবং লবন এর মিশ্রণ দিতে হবে এবং চুলার উপর থেকে নামিয়ে ভালভাবে নাড়তে হবে যাতে আঠালো আঠালো ভাব তৈরী হয়। তারপর নির্দিষ্ট ছাচে (১কেজি/২কেজি) ঢেলে ঢেকে দিতে হবে। ইউ.এম.বি শক্ত হয়ে গেলে তা কিছুক্ষণ খোলা রেখে দিলে শক্ত হয়ে যাবে যা গবাদিপশুকে খেতে দেয়া যাবে। গবাদিপশু চেটে চেটে দৈনিক ২৫০-৩০০ গ্রাম ইউ.এম.বি খাবে।

গো-খাদ্য হিসাবে এ্যালজির ব্যবহারঃ
ক্লোরেলা ও সিনডেসমাস নামক এলজি গো-খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যায়। এতে ৫০-৭০% আমিষ, ২০-২২% চর্বি এবং ৮-২৬% শর্করা থাকে যা রূমন্থনকারী গবাদি পশুর জন্য অত্যন্ত উপকারী। এক্ষেত্রে ১০ফুট লম্বা, ৪ ফুট প্রশস্ত ও ১-২ ফুট গভীর পুকুরাকৃতির গর্ত করে পলিথিন বিছিয়ে দিতে হবে। তারপর আগের দিন ভেজারো ১০০ গ্রাম মাসকলাই ভূষি মিশানো পানি থেকে পানি ছেকে নিতে হবে। এবার কৃত্রিম পুকুরে পলিথিনের উপর ২০০ লিটার পানি দিয়ে তাতে ১৫-২০ লিটার এ্যালজী বীজ ঢেলে দিয়ে ভাল করে মিশাতে হবে এবং ২-৩ গ্রাম ইউরিয়া সার পানিতে মিশাতে হবে। প্রতিদিন ৩-৪ বার পুকুরের পানি নেরে দিতে হবে এবং ৩-৪ দিন পর পর ২-৩ গ্রাম ইউরিয়া সার পানিতে মিশাতে হবে। প্রয়োজন অনুসারে পুকুরে অতিরিক্ত পানি যোগ করতে হবে। ১২-১৫ দিনের মধ্যে পুকুরের পানি সবুজ রং ধারণ করবে যা গো-খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা যাবে। একটি ১৫০ কেজি ওজনের গরু দৈনিক প্রায় ১২ লিটার এ্যালজী খেতে পারে।

সবুজ ঘাস সংরক্ষণঃ
বাংলাদেশে বর্ষাকালে প্রচুর সবুজ ঘাস জন্মে যা সংরক্ষণ করা গেলে সারা বছরই গবাদিপশুকে সবুজ ঘাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে। সবুজ ঘাস অনেক দিন সংরক্ষণ করে রাখার একটি পদ্ধতি হলো সাইলেজ প্রস্তুতি। এই পদ্ধতিতে মাটিতে গর্ত করে স্তরে স্তরে সবুজ ঘাস ও শুকনো খর পলিথিনে মোড়িয়ে এবং মোলাসেস ছিটিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এক্ষেত্রে একটু উচু স্থানে গর্ত করতে হয়। সাধারণত ১০০ সিএফটি গর্তে প্রায় ৩ মেট্রিকটঁন সবুজ ঘাস সংরক্ষণ করা যায়। গর্তের আকার সাধারণত ৩ ফুট গভীর প্রস্তে তলায় ৩ ফুট মাঝ বরাবর ৮ ফুট এবং মাটি উপরের দিকে ১০ফুট হবে এবং ঘাসের পরিমান অনুযায়ী দৈর্ঘ নির্বাচন করতে হয়। গর্ত তৈরীর পর বড় পলিথিন গর্তে বিছিয়ে দিতে হবে। এবার ঘাসের পরিমাণের ১৫-২০% শুকনো খর এবং ৩-৪% চিটাগুড় নিতে হবে। চিটাগুড় ৪ঃ৩ অনুপাতে পানির সাথে মিশিয়ে ঘন দ্রবণ তৈরী করতে হবে।

এবার গর্তে শুকনো খর ও সবুজ ঘাস স্তরে স্তরে সাজাতে হবে এবং চিটাগুড়ের মিশ্রণ সবুজ ঘাসের উপর স্প্রে/ছিটিয়ে দিতে হবে। খর ও ঘাসের স্তর মাটির উপরে ৪-৫ ফুট উচু পর্যন্ত সাজাতে হবে এবং যত সম্ভব এটে চাপিয়ে দিতে হবে। এবার সবুজ ঘাসের উপর শুকনো খর বিছিয়ে দিয়ে পলিথিন ভালভাবে এটে দিতে হবে। বৃষ্টি না থাকলে এ প্রক্রিয়া কয়েকদিনেও করা যাবে। এভাবেই সবুজ ঘাস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ ও গবাদিপশুকে খাওয়ানো যাবে। সাইলো করা ঘাস ১০০ কেজি ওজনের গরুকে দৈনিক ১০ কেজি পর্যন্ত খাওয়ানো যায়।
উপরোল্লেখিত প্রযুক্তি ছাড়াও বর্ষাকালে ভিজা খর সংরক্ষণ, কলাগাছের সাইলেজ তৈরী ও সরাসরি কলাগাছ গো-খাদ্য হিসাবে ব্যবহার, ডাক উইড উৎপাদন ও গো-খাদ্য হিসাবে ব্যবহার সংক্রান্ত প্রযুক্তি আছে যা খামারিগণ ব্যবহার করে গরুর খামার করে লাভবান হতে পারে।

গাভীর ও বাছুরের যত্ন:

গর্ভবতী গাভীর যত্ন ও পরিচর্যা:
গর্ভ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে এবং বাচ্চা প্রসবের সম্ভাব্য সময় বা দিন তারিখ নির্ণয় করতে হবে। গর্ভবতী গাভী দিয়ে হালচাষ, লাঙ্গল টানা, গাড়ী টানা, ঘানি টানা, ধানের খড় মাড়ানো ইত্যাদি শ্রমসাধ্য কাজ করানো যাবে না।

গর্ভবতী গাভী দুগ্ধবতী হলে গর্ভধারণের ৭ মাসের পর দুগ্ধ দোহন ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে হবে।নিজের পুষ্টি ও গর্ভের বাচ্চার বেড়ে উঠার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর সবুজ ঘাস ও দানাদার খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

নিয়মিত সহজপাচ্য খাদ্য দিতে হবে এবং কোনরূপ সমস্যাবোধ হলে স্থানীয় ভেটেরিনারিয়ান এর পরামর্শ নিতে হবে।
দলের অন্যান্য গরু থেকে পৃথক রেখে যত্ন ও পরিচর্যা করতে হবে।

গর্ভবতী গাভীর প্রসব বেদনার লক্ষণ:
গাভীর ওলান ফুলে উঠে আকার বাড়তে থাকে’ লেজের গোড়ার দুপাশে গর্তের মত আকার স্পষ্ট হবে। যোনীমুখ দিয়ে সাদা তরল আঠালো পদার্থ বের হতে দেখা যাবে, যোনীমুখ বড় হয়ে ঝুলে যাবে এবং নরম ও ফোলা ফোলা হয়ে যাবে এবং গাভী বার বার উঠা বসা করবে।

যোনী পথ দিয়ে পানির থলি বেরিয়ে আসবে। গাভীর যোনী পথ দিয়ে বাছুরের সামনের দুপা ও মুখ এক সঙ্গে বেরিয়ে আসবে।

প্রসবপূর্ব প্রস্তুতি ও জটিলতা এড়ানো:
প্রসবকালিন সময়ে গাভীতে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে। যেমন-গাভীর যোনীমুখের আকার ছোট কিন্তু বাছুরের আকার বড় হলে প্রসবে জটিলতা, বাছুরের শুধু পা বা মাথা বা এক পা ও মাথা বেরিয়ে আসা, জরায়ু বেরিয়ে আসা, জরায়ু প্রদাহ, প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল না পড়া বা পড়তে খুব বিলম্ব হওয়া, ইত্যাদি। এসব জটিলতা এড়ানোর জন্য সম্ভাব্য প্রসব তারিখের অন্তত ৩ মাস পূর্ব থেকেই গাভীকে সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে হয়, ফলে গাভী সবল থাকে।

তাৎক্ষনিক জটিলতা এড়ানোর জন্য দক্ষ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রয়োজনে শল্য চিকিৎসা নিতে হবে। গাভীকে নিরিবিলি স্থান দিতে হবে, বালতি ভর্তি বিশুদ্ধ পানি, জীবাণু মুক্ত ধারালো ব্লেড, পরিস্কার গজ বা জীবাণু মুক্ত পরিস্কার কাপড়, ইত্যাদি প্রস্তুত রাখতে হবে।

সদ্যজাত বাছুরের যত্ন ও পরিচর্যা:
বাছুরকে দাড়াতে সাহায্য করতে হবে এবং গাভীর বাট পরিস্কার করে বাছুরকে দুধ চুষে খেতে সাহায্য করতে হবে।
কোনভাবেই শাল দুধ ছেকে ফেলে দেয়া যাবে না, বাছুরকে খেতে সাহায্য করতে হবে। শালদুধে যথেষ্ট পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও এন্টিবডি থাকে এবং এই দুধ খেলে বাছুরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। বাছুরকে পাটের তৈরী চট বা শুকনো বিচালীর বিছানায় থাকতে দিতে হবে।

দুগ্ধবতী গাভীর যত্ন ও পরিচর্যা:
গাভীকে পর্যাপ্ত সবুজ ঘাস, খড় ও সুষম দানাদার খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। প্রতিদিন একই ব্যক্তি দ্বারা একই নিয়মে একই সময়ে দোহন করতে হবে। গাভীর থাকার জায়গা ও ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

গোবর-চনা নিয়মিত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করতে হবে ও গাভীকে নিয়মিত গোসল না করালেও অন্ততঃ গাভীর ওলান সহ পিছনের অঙ্গ পরিস্কার পানি দিয়ে ধৌত করতে হবে। বাছুরকে দুধ খেতে দিতে হবে এবং গাভীর নিকটবর্তী দুরত্বে দৃষ্টি সীমার মাঝে বাছুর রাখতে পারলে ভাল।
গাভী হতে প্রতিদিন একই সময়ে এবং একই ব্যক্তি দিয়ে বা মেশিন ব্যবহার করে দুধ দোহন করতে হবে। দোহনের পর জীবাণুনাশক মিশানো পানি দিয়ে ওলান ধুয়ে রাখতে হবে।

বাছুরের খাদ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনা:
জন্মের পর থেকে অন্তত: ৩ মাস বয়স পর্যন্ত বাছুরকে নিয়মিত অন্তত: দুবেলা মায়ের দুধ খেতে দিতে হবে। বাছুরের ওজনের ন্যূনতম ১০ ভাগের এক ভাগ অর্থ্যাৎ ২০ কেজি ওজনের বাছুরের জন্য দৈনিক অন্তত: ২ লিটার দুধের প্রয়োজন। অন্যথায় বাছুরের স্বাস্থ্য খারাপ হবে এবং কৃমির আক্রমণ হতে পারে। দু সপ্তাহ পর থেকে বাছুরকে নরম সবুজ কাচা ঘাস ও দানাদার খাদ্য দিতে হবে, এতে পাকস্থলীর পরিপক্কতা আসবে এবং হজম শক্তি বাড়বে।
প্রথম সপ্তাহে ২ লিটার, ২য় সপ্তাহে ৩ লিটার, ৩য় সপ্তাহ থেকে ৩ মাস বয়স পর্যন্ত দৈনিক ৪ লিটার, ৪র্থ মাসে ৩ লিটার দুধ এবং একই সময়ে ২য় সপ্তাহ থেকে যথাক্রমে ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম ও ৭৫০ গ্রাম কাফ স্টার্টার (দানাদার খাদ্য মিশ্রণ) ও পাশাপশি পরিমানমত নরম সবুজ ঘাস খেতে দিতে হবে। কাফ স্টার্টারে শতকরা ৫০ ভাগ গমের ভুষি বা ভুট্টা ভাঙ্গা, ২৪ ভাগ ডালের ভূষি ও ছোলা ভাঙ্গা মিশ্রণ, ২৫ ভাগ খৈল ও ১ ভাগ খনিজ লবণ থাকতে হবে।

গবাদি পশুর রোগ ব্যবস্থাপনাঃ
সুস্থ প্রাণীর সাধারন বৈশিষ্ট্য: সক্রিয়, চটপটে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সমন্ধে সচেতন এবং নিয়মিত পদক্ষেপে চলবে। দৈহিক কাঠামো সুন্দর, চামড়া মসৃণ, চকচকে, ঢিলা থাকবে। পিঠ লম্বা ও সরল রেখায় থাকবে, চোখ থাকবে উজ্জল এবং চোখের কোনায় কোন প্রকার ক্ষরণ বা পিচুটি থাকবে না, কান থাকবে খাড়া। মাছি তাড়াতে সবসময় লেজ নাড়াবে, শ্বাস-প্রশ্বাস হবে মন্থর ও নিয়মিত, বিশ্রামের সময় নিয়মিত ‘জাবর’ কাটবে।

রোগের সাধারণ লক্ষণ:
পশু রোগাক্রান্ত হলে শরীরের তাপমাত্রা কমে যায় বা বৃদ্ধি পায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের পরিবর্তন ঘটে ও খাদ্য গ্রহনে অনীহা দেখায়।
জাবর কাটা বন্ধ হয়ে যায়/কমে যায়, পায়খানা পাতলা, শক্ত/নরম হতে পারে। কান ঝুলে পড়ে, আক্রান্ত প্রাণীকে বিমর্ষ ও অস্থির দেখায়।
নাক দিয়ে পানি পড়া, কাশি হওয়া, ঘনঘন প্রস্রাব হওয়া, লালা পড়া, চামড়া/লোম উষ্কোখুস্কো হওয়া ইত্যাদি লক্ষণ,দেখা দিতে পারে।

রোগ বিস্তারের কারণ:
রোগ বিস্তার পদ্ধতি বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হতে পারে। সাধারণত অসুস্থ্য গবাদিপশুর পায়খানা প্রসাব, লালা, চোখের/নাকের পানি, কাঁশি এবং এসব হতে নি:সৃত তরল পদার্থ দ্বারা রোগজীবানু বের হয়ে যে কোন খাদ্য, যন্ত্রপাতি, পানি ও ব্যবহারিক জিনিসপত্র দূষিত করতে পারে। কোন কোন রোগের জীবানু বাতাসে বাহিত হতে পারে এমনকি মাটি, পানি দূষিত করে ছড়াতে পারে। দূষিত বস্তুতে রোগ-জীবাণু অনেক দিন বিশেষ করে তড়কা বা এনথ্রাক্স রোগের জীবাণু ২০ বৎসর পর্যন্ত মাটিতে সক্রিয় থাকতে পারে।

ক্ষুরা রোগের জীবাণু অনকূল বাতাসের মাধ্যমে কয়েক মাইল দূরেও সক্রিয অবস্থায় যেতে পারে। দূষিত বায়ু, পানি ও খাদ্য গ্রহন করলে, খাদ্যের পাত্র ও অন্যান্য ব্যবহার্য্য যন্ত্রপাতি অপরিস্কার অবস্থায় ব্যবহার করলে জীবাণু খাদ্যের সাথে মিশ্রিত হয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। মশা-মাছি, আঠালী ও উকুনের মাধ্যমে, সুস্থ্য গাবদিপশু অসুস্থ্য গবাদিপশুর সংস্পর্শে আসলে এমনকি প্রজননের মাধ্যমেও রোগ জীবানু শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

রোগ নিয়ন্ত্রনঃ
গবাদি পশুর বয়স ২ মাস হতে শুরু করে বছরে ২-৩ বার সঠিক মাত্রায় ক্রিমি নাশক খাওয়াতে হবে।
সুস্থ্য গবাদিপশুকে অসুস্থ্য গবাদি পশু থেকে আলাদা রাখতে হবে। রোগ দেখার সাথে সাথে স্থানীয় ভেটেরিনারি চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিতে হবে। মৃত পশু সঠিক নিয়মে ধংস, সৎকার/মাটিতে পূঁতে ফেলতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ডিজইনফেকশন করতে হবে।
সুস্থ্য পশুকে সংক্রামক রোগ সমূহের প্রতিরোধে টিকা প্রদান করতে হবে। খামারে জীব নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

টীকাবীজ প্রয়োগ ও রোগ প্রতিরোধ:
গবাদি পশু প্রতিপালনের অন্যতম সমস্যা রোগ-বালাই। গবাদি পশু রোগে আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গৃহীত পদক্ষেপকে রোগ প্রতিরোধ বলা হয়। একটি পশু অসুস্থ্য হওয়ার পর তাকে আরোগ্য করতে চিকিৎসা ও ঔষধ ব্যয়তো আছেই, তদুপরি ভগ্ন স্বাস্থ্য পূর্বাবস্থায ফিরিয়ে আনাও কষ্টসাধ্য। তাই রোগ যাতে পশুকে আক্রান্ত করার সূযোগ না পায় সেরকম ব্যবস্থা গ্রহন করাই শ্রেয়। সেজন্য স্বাস্থ্যসম্মত ব্যবস্থাপনা ও সুষম খাদ্য খাওয়ানোর পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধের টীকাবীজ করা উচিৎ। গাভীকে সাধারণত ক্ষুরারোগ, তড়কা, গলাফুলা রোগের টিকা প্রদান করতে হয় এবং বাছুরের ক্ষেত্রে এসকল রোগের পাশাপাশি বাদলা রোগেরও টিকা প্রয়োগ করতে হয়।

জীব-নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাঃ
গবাদি পশু পালনকে লাভজনক করতে হলে খামারের জীব-নিরাপত্তা শক্তিশালী হওয়া বাঞ্চনিয়। কেননা জীব-নিরাপত্তা জোরদার করা হলে গবাদিপশু অনেক রোগ হতে রক্ষা পায়। জীব-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে করনীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো;
খামারের চারপাশে বাউন্ডারী ওয়াল থাকতে হবে। খামারের প্রবেশ পথে ফুটবাথ থাকবে এবং ফুটবাথে এন্টিসেপটিক মেশানো পানি থাকবে।
ভিজিটরদের এবং যানবাহন প্রবেশ সংরক্ষিত থাকবে, খামরে ব্যবহারের জন্য আলাদা পোষাকের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
খামারে সুস্থ্য ও অসুস্থ্য পশুর জন্য আলাদা সেড থাকবে। বয়সভেদেও আলাদা সেড থাকা প্রয়োজন। খাদ্য মজুদ, অফিস, রেকর্ড কক্ষ, মেটারনিটি, ঔষদ ইত্যাদির জন্য আলাদা কক্ষ থাকা প্রয়োজন।
খামারের চারপাশে মাঝে মাঝে এন্টিসেপটিক ¯েপ্র করার ব্যবস্থা করতে হবে। খামার থেকে সময়ে সময়ে অনুৎপাদনশীল/কম উৎপাদনশীল গাভী ছাটাইয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। মৃত পশু সঠিকভাবে সৎকার বা পুড়িয়ে ধংস করার এবং ডিজইনফেকশণ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বাজার ব্যবস্থাপনাঃ
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগী পালনকে লাভবান করতে হলে এসকল খামারের সাথে বাজার এর সরাসরি সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। যাতে খামারের প্রয়োজনীয় ইনপুট সহজলভ্য হয় অন্য দিকে খামারে উৎপাদিত দুধ, মাংস ও ডিম সহজেই বাজারজাত করা যায়। দেশে বর্তমানে অল্পসংখ্যক প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপিত হয়েছে। প্রক্রিয়াজাত কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে গবাদিপশু- পাখি পালনকারী খামারীর সংখ্যা, এবং খামার থেকে উৎপাদন উত্তোরোত্তর আরো বৃদ্দি পাবে।

নথি ব্যবস্থাপনাঃ
একটি খামারকে লাভজনক করতে হলে খামারের প্রতিটি বিষয়কে রেকর্ডিং এর আওতায় আনা প্রয়োজন। এসকল তথ্যাদি সংরক্ষণের নিমিত্তে পশুর জাত, সংখ্যা, বয়স সংক্রান্ত নথি, প্রজনন তথ্য সংক্রান্ত নথি, বাচ্চ উৎপাদন নথি, দুধ উৎপাদন নথি, স্বাস্থ্য বিষয়ক নথি, টিকা প্রদান নথি, অর্থনৈতিক নথিসহ অন্যান্য নথি অবশ্যই সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করতে হবে।

গরু মোটাতাজাকরণ প্রযুক্তিঃ
প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎস হলো গো-মাংস। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে গো-মাংসের উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি করার একটি প্রযুক্তি হলো গরু মোটাতাজাকরণ প্রযুক্তি। গরু মোটাতাজাকরণ প্রযুক্তির ব্যবহারে বিবেচ্য বিষয়াদি নিম্নে উপস্থাপিত হলো;

পশু নির্বাচন:
দেশী গরুর তুলনায় সংকর জাতের গরু দ্রুত বৃদ্ধি পায় বিধায় সংকর জাতের গরু নির্বাচন করা উত্তম।
এঁঢ়ে বা ষাঁড় গরু নির্বাচন করতে হবে যার বয়স ২.৫ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ।
গরুর দেহ আয়তকার, লম্বা, রোগমুক্ত, মসৃণ ও ঢিলা চামড়া বিশিষ্ট হতে হবে।
কালচে লাল বা লাল বা কালো গরুর চাহিদা বেশী।

খামারের স্থানঃ
পর্যাপ্ত আলো-বাতাস যুক্ত সামান্য উচু ভূমিতে খামার স্থাপন করতে হবে।
পানি ও ময়লা নিস্কাশনের সুবিধা থাকতে হবে। লোকালয় থেকে দূরে এবং ঘাসের জমির কাছাকাছ খামার স্থাপন করতে হবে।
খামার এক সারি বা দুই সারি বিশিষ্ট হতে পারে।

ক্রয়কৃত গরুর যত্ন:
পশু ক্রয়ের পর ৭ দিন আলাদাভাবে রাখতে হবে। এ সময় গরুর গোবর পরীক্ষা করে কৃমিনাশক প্রদান করে কৃমিমুক্ত করতে হবে।
তড়কা, বাদলা, গলাফুলা ও ক্ষুরা রোগের টিকা প্রদান করতে হবে।
গরুকে নিয়মিত গোসল ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে হবে।
খামারের জীব-নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
গরুকে কোন পরিশ্রম না করিয়ে পর্যাপ্ত পরিমানে সুষম খাদ্য ও পানি সরবরাহ করতে হবে।
কোন গরু অসুস্থ্য হয়ে গেলে তা সাথে সাথে অন্য গরু থেকে আলাদা করতে হবে এবং স্থানীয় ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।

খাদ্য ব্যবস্থাপনাঃ
গরুকে দৈহিক ওজনের শতকরা এক ভাগ হারে দানাদার খাদ্য ও ২ ভাগ হারে আঁশ জাতীয় খাদ্য সরবরাহ করতে হবে।
খাদ্য ২-৩ ভাগ করে দিন ব্যাপী সরবরাহ করতে হবে। দানাদার খাদ্যের মিশ্রণ সঠিক রাখতে হবে।
খড়ের পরিবর্তে ইউএমএস খাওয়ালে দ্রুত মোটাতাজা হবে। শুকনো আঁশ জাতীয় খাদ্য (খড়) ছোট ছোট করে কেঁটে পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ালে এর পাচ্যতা বাড়ে এবং মোটাতাজাকরণে সুফল পাওয়া যায়।
গরুকে পর্যাপ্ত পরিমানে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করতে হবে।

বাজারজাতকরণ:
গরু মোটাতাজাতাকরণ খামার করে লাভবান হতে হলে বাজারসংযোগ থাকতে হবে। সাধারণত যখন ওজন বৃদ্ধির হার বেশী তখন বিক্রি না করাই ভাল তবে বাজারে ভাল মূল্য পাওয়া গেলে বিক্রি করা যেতে পারে। গরু মোটাতাজাকরণকাল ৪-৬ মাসের বেশী হওয়া উচিত নয়।

♠♠ আপনার কৃষি সম্পর্কে কিছু বলার বা জানার থাকলে, আপনি আমাদের ফেজবুক পেজ বা ফেজবুক গ্রুপে যোগ দিতে পারেন এবং আপনার প্রয়োজনীয় মতামত জানাতে পারেন।

বিঃদ্রঃ খামার সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে চাইলে আপনি এই লিংকে ক্লিক করুনঃ খামার কি? কৃষি কি?-বিস্তারিত দেখুন -পর্ব ০১। 

♦♥ তথ্যটি শেষ পর্যন্ত পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ♥♦

🚻  ✔✔ এগ্রো হ্যাভেন বিডি ফেসবুক পাতা 
🚻  ✔✔ Agro Haven BD ফেসবুক গ্রুপে
🚻  ✔✔ আমাদের মেইল করুন

মহা-পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব)
ডাঃ মোছাদ্দেক হোসেন

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ, ঢাকা।

 

গাভী পালন, গাভী পালন প্রশিক্ষণ, গাভী পালন পদ্ধতি pdf, গাভী পালনে লাভ, গাভী পালন পদ্ধতি, গাভী পালন বই, উন্নত গাভী পালন, উন্নত জাতের গাভী পালন, গাভী পালন গরু, গর্ভবতী গাভী পালন, জার্সি গাভী পালন, দেশি গাভী পালন পদ্ধতি, দেশী গাভী পালন, দেশি গাভী পালন, দুগ্ধবতী গাভী পালন, দুগ্ধজাত গাভী পালন, দুগ্ধ গাভী পালন, গাভী পালনের নিয়ম, গাভী পালন পিডিএফ, গাভী পালনের প্রশিক্ষণ, ফ্রিজিয়ান গাভী পালন, বিদেশী গাভী পালন, ,সংকর জাতের গাভী-বাছুর পালন ও চিকিৎসা, গাভী গরু পালন,

Leave a Comment

Your email address will not be published.